বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

লবণাক্ত জমিতে কৃষি : জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সমাধান

 লবণাক্ত জমিতে কৃষি : জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন সমাধান

দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকা,
ই- পেপার ভার্সন ক্লিক

| প্রজ্ঞা দাস



ব র্তমান সময়ের বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন। । জলন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পুরো বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশ খুব বাজেভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু


বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ কিংবা অনুন্নত দেশগুলোর সমস্যার পরিমাণটা একটু বেশিই। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, খরা, সমুদ্র পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলকে তলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলো। দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলায় প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি এখন লবণের কবলে। ১৯৭৩ সালে ছিল ৮৩ হাজার হেক্টর। যতই সময় পার হচ্ছে জলবায়ুও ততই দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে লবণাক্ততাও ক্রমেই বাড়ছে। কয়েক দশক আগেও যেখানে বিস্তীর্ণ জমিতে ধান, শাকসবজি আর নানা ফসল ফলত, সেখানে এখন অনেক জায়গায় মাটিতে লবণের সাদা আস্তরণ দেখা যায়। অনেক কৃষক তাই বাধ্য হয়ে জমি ফেলে রেখেছেন বা অন্য পেশায় চলে গেছেন। কিন্তু এই সংকটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নতুন সম্ভাবনার বীজ। সেই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করতে পারলেই লবণাক্ত জমির অভিশাপ থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব। সঠিক কৌশল জানা থাকলে এটিই হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে কৃষির নতুন পথ। লবণাক্ত জমিতে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের নতুন দিগন্তই খুলে দিতে পারে না, বরং এটি উপকূলীয় অর্থনীতিকে নতুনভাবে দাঁড় করাতে পারে। এক্ষেত্রে লবণাক্ত জমিতে কৃষির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল


হলো লবণসহনশীল ফসল নির্বাচন। কৃষিবিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এমন অনেক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো লবণাক্ত মাটিতেও ভালো ফলন দিতে পারে। ব্রি ধান ৬৭, ব্রি ধান ৯৭, ব্রি ধান ৯৯, ব্রি ধান ১১২-এর মতো এই জাতগুলো ১০-১২ ডেসি সিমেন্স প্রতি মিটার লবণও সহ্য করতে পারে। তাছাড়া সাধারণ ধান যেখানে ৪-৫ টন ফলন দেয়, এগুলো সেখানে ফলন দেয় ৫-৬ টন পর্যন্ত। এখনই উপকূলের ৩৫ শতাংশ লবণাক্ত এলাকায় এই জাতগুলোর চাষ হচ্ছে। যার মাধ্যমে শুধু ব্রি-এর স্ট্রেস-টলারেন্ট জাতগুলো প্রতিবছর অর্থনীতিতে যোগ করছে প্রায় ১৫২৫ মিলিয়ন ডলার। এই ধারা অব্যাহত রেখে এবং এর মাত্রা আরও বাড়াতে পারলে অর্থনীতিতে এই উপকূলীয় অঞ্চলই লবণাক্ততার সঙ্গে যুদ্ধ করেও বড় অবদান রাখতে পারবে। তবে লবণাক্ত জমির কৃষি শুধু ধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখন এ ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে নতুন নতুন পথ খুলছে। ডাচ বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে শুরু হয়েছে সল্ট সল্যুশন প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলের কৃষকদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে লবণাক্ত মাটিতেও ফলন বাড়ানো যায়। কৃষকরা এখন শিখছেন সারজান পদ্ধতি। যার মাধ্যমে উঁচু করে মাটির বিছানা বানিয়ে চাষ করা হয়। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে খড় দিয়ে মালচিং, অল্প পানিতে সেচ দেওয়ার জন্য ড্রিপ সেচ, আর বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের। এখানেই শেষ নয়, মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণের পরীক্ষা করে ঠিক করা হচ্ছে কোন জমিতে কোন ফসল ভালো হবে। এর মাধ্যমে ফলও মিলছে বেশ দ্রুত। উপকূলীয় অঞ্চলে এখন আলু, গাজর, লাউ, পালংশাক, তরমুজ কিংবা সূর্যমুখীর মতো ফসলও চাষ হচ্ছে বেশ ভালোভাবেই। কৃষির এই পরিবর্তন এখানেই থেমে নেই। এখন গবেষণা চলছে হ্যালোফাইটের মতো লবণপ্রেমী উদ্ভিদ নিয়েও। এসব ফসল শুধু দেশের খাবারের চাহিদাই মেটাবে না, রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার পথও খুলে দেবে। তবে পথটা একেবারে সহজ নয়। উপকূলের


অনেক জায়গায় এখনও লবণাক্ততা বাড়ছে, মিষ্টি পানির সংকট রয়েছে। অনেক কৃষকের কাছে নতুন কৃষি প্রযুক্তির তথ্যও সহজে পৌঁছায় না। আবার কিছু এলাকায় চিংড়ি চাষের কারণে মাটির লবণাক্ততা আরও বেড়ে যাচ্ছে। তারপরও আশার আলো দেখাচ্ছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং প্রকল্পগুলো। এসব প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৩০ হাজারেরও বেশি কৃষক লবণসহনশীল ফসল চাষের কৌশল শিখেছেন। পাশাপাশি সরকার, বিভিন্ন এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ধীরে ধীরে একটি সহায়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় অনেক কৃষক এখন নিজেরাই অন্য কৃষকদের শেখাচ্ছেন। এটি শুধু কৃষকের একার সংগ্রাম নয়। সরকারকে গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন করা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে এনজিও এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহযোগিতাও অতীব জরুরি। আমাদের উপকূলের মাটি কেবল সাধারণ নোনা মাটিই নয়, এই মাটি আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর উত্তরসূরির ভবিষ্যতের মিশেল। আর এই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যেকটা কৃষকই এক একজন যোদ্ধা। রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী কিংবা সমাজের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই যদি তাদের পাশে দাঁড়াই, তবে এই নোনা মাটিই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি। আর এই ভিত্তি থেকেই দেশ একদিন স্বর্ণশিখরে আহরণ করবে। সেদিন বাংলাদেশ পুরো পৃথিবীর সামনে হয়ে উঠবে লবণাক্ততাকে জয় করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক সাহসী অর্থনীতির নাম।


প্রজ্ঞা দাস: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

Post a Comment

Previous Post Next Post