মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে বিবেচনা করা হয়। ত্রিশেরও বেশি রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে পড়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নগরসভ্যতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবমাননা—এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেছিলেন, শক্তির রাজনীতি যদি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে তবে মানবসভ্যতা বারবার একই ধ্বংসচক্রে আটকে পড়বে।
এই উপলব্ধি থেকেই যুদ্ধোত্তর বিশ্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শান্তি রক্ষার জন্য গড়ে ওঠে নতুন কিছু কাঠামো। এর কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ। এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ সুগম করা।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রায় আট দশক ধরে যে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা আজ যেন ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোর পেশিশক্তির প্রতিযোগিতায় মধ্যম ও ছোট রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ, সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তির নামে প্রতিষ্ঠিত যেসব প্রতিষ্ঠান যুদ্ধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তাদের অনেককেই আজ নীরব দর্শক বলে মনে হয়। এই নীরবতা কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি নৈতিক, রাজনৈতিক এবং মানবিক সংকটেরও প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানকে পরাশক্তির ইশারায় পরিচালিত এক ধরনের অসহায় কাঠামো বলেই মনে হয়।
ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তাকে অনেক সময় নিরাপত্তা বা পারমাণবিক কর্মসূচি রোধের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এর চেয়ে অনেক গভীর। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে ইরান এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যার মাটির নিচে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলসম্পদ এবং যার আশপাশে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ মানেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব বিস্তার।
এই বাস্তবতায় ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। তাই ইরানকে ঘিরে সংঘাত কেবল সামরিক অভিযানের প্রশ্ন নয়, বরং শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলন।
কোনো অঞ্চলে সংঘাত বা উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যুদ্ধ শুরু হলেও তা থামানোর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা আজ দৃশ্যমান নয়। জাতিসংঘ কিংবা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রধান দায়িত্ব ছিল যুদ্ধ প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক সময় বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থের চাপে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়।
যখন কোনো শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে, তখন আন্তর্জাতিক নিয়ম ও কূটনৈতিক জটিলতার বেড়াজালে সিদ্ধান্ত থমকে যায়। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো বড়জোর যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরতে পারে। কিন্তু তাদের হাতে এমন কোনো ক্ষমতা নেই, যা দিয়ে একটি উড়ন্ত ক্ষেপণাস্ত্র বা ধেয়ে আসা ট্যাঙ্ক থামানো সম্ভব।
ফলে এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—যেখানে বিশাল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, অগণিত কর্মকর্তা এবং অসংখ্য নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের লেলিহান শিখার সামনে বিশ্বব্যবস্থা অনেক সময় অসহায় দর্শকে পরিণত হয়।
এই ব্যর্থতার পেছনে কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের হাতে থাকা ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে। যখন কোনো শক্তিধর দেশের স্বার্থে আঘাত লাগে, তখন আন্তর্জাতিক আইন অনেক সময় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অবস্থাও দুর্বল। কাগজে-কলমে নীতিমালা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে বৈশ্বিক ঐক্য ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তা আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল লিগ অব নেশনস। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্ব অল্প সময়ের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছিল। বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও যদি একইভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে আঞ্চলিক সংঘাত ধীরে ধীরে বৃহত্তর বৈশ্বিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো এখনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক উত্তেজনার বর্তমান প্রবণতা সেই আশঙ্কাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও দেয় না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে শক্তিশালী করা জরুরি। বহুপাক্ষিক কূটনীতি জোরদার করা, আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপ বাড়ানো এবং উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য।
সংঘাতের প্রতিটি ধাপে সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া টেকসই শান্তির কোনো বিকল্প নেই। মানবসভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো কিংবা তার চেয়েও ভয়াবহ কোনো সংঘাত যেন আর পৃথিবীকে গ্রাস না করে—এটাই আজ বিশ্বমানবতার প্রত্যাশা।
বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল আদর্শে ফিরে আসুক এবং জাতিসংঘ সত্যিকার অর্থে পরাশক্তির প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারুক—এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে জরুরি। অন্যথায় ইতিহাস আবারও এক রক্তাক্ত বাস্তবতার সাক্ষী হতে পারে, যা মানবসভ্যতার জন্য কখনোই কাম্য নয়।
Post a Comment