প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকা
বিজ্ঞান না ভূ-রাজনীতি
দ্বি তীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই মহাকাশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের এখন বীজ বপন করা হয়েছিল। আর বর্তমান সময়ে সেই বপিত বীজই মহিরুহ বৃক্ষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেখানে যে দেশ মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সে দেশ পুরো পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন এবং ড্রোন হামলার মূল চাবিকাঠি মহাকাশেই। ফলে, বিজ্ঞানের উন্নতির দোহাই দিয়ে যে স্যাটেলাইটগুলো উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মূলত প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারি এবং যুদ্ধের সময় নিখুঁতভাবে আক্রমণ করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মহাকাশ প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামরিক ব্যবহার। বর্তমানে বিভিন্ন দেশ মহাকাশে অস্ত্র-ব্যবস্থা তৈরি এবং পরীক্ষার দিকে এগোচ্ছে। ২০০৭ সালে চীন একটি অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল
পরীক্ষা করে নিজস্ব উপগ্রহ ধ্বংস করে।
২০১৯ সালে ভারতও একই ধরনের পরীক্ষা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ করছে। মহাকাশে এই সামরিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যেও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ উপগ্রহ ধ্বংস হলে তা হাজার হাজার ধ্বংসাবশেষ তৈরি করে এই ধ্বংসাবশেষ কক্ষপথে শতাব্দী ধরে থাকবে এবং কেসলার সিন্ড্রোমের ঝুঁকি বাড়াবে। যেখানে একটি সংঘর্ষ অন্য সংঘর্ষ ঘটিয়ে পুরো কক্ষপথ অকেজো করে দিতে পারে। এই ধ্বংসাবশেষের অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিপুল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো প্রতিকার ছাড়া এটা বিশ্ব জিডিপির ১.৯৫% ক্ষতি করতে পারে দীর্ঘমেয়াদে। এ ছাড়া মহাকাশ অর্থনীতি এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল খাতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক মহাকাশ
অর্থনীতির মূল্য ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে এটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো মহাকাশ প্রতিযোগিতার নামে দেশগুলো যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তা দিয়ে পৃথিবীর দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। অথচ কেবল আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে সামরিক স্যাটেলাইটের পেছনে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে যাচ্ছে। অস্ত্রের প্রতিযোগিতার কারণে অনেক দেশ তাদের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় করছে মহাকাশ প্রযুক্তিতে, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের সংস্কার অতিব জরুরি। সেই লক্ষ্যে সকল দেশের সমন্বয়ে মহাকাশকে সামরিকীকরণমুক্ত করতে একটি কঠোর এবং বাধ্যবাধকতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মহাকাশ প্রযুক্তি যেন কেবল কয়েকটি দেশের কুক্ষিগত না থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণীর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি মহাকাশ মিশনের উদ্দেশ্য এবং কারিগরি তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে বিজ্ঞানের আড়ালে সামরিক হামলার ছক কোনো রাষ্ট্র তৈরি করতে না পারে। জাতিসংঘের অধীনে একটি বৈশ্বিক তহবিল গঠন করা যেতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মহাকাশ গবেষণায় সহায়তা করবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। সর্বোপরি মহাকাশ যেন শুধু বড় শক্তির হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, বরং মানবজাতির যৌথ অগ্রগতির সেতু হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
প্রজ্ঞা দাস
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ

Post a Comment