বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

বঙ্গাব্দের জন্মকথা

 বঙ্গাব্দের জন্মকথা

প্রতিদিনের বাংলাদেশ সংবাদ,
১৪ এপ্রিল ২০২৬
ই পেপার-

প্রজ্ঞা দাস




শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা


ব "ঙ্গাব্দের ইতিহাস এবং আজকের বাংলা নববর্ষ উদযাপন উভয়েই একই সুতোয় বাঁধা ঘটনা। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়, এটি সময় মাপার এক অনন্য বাঙালি পদ্ধতির ধারাবাহিকতা, কৃষিজীবনের ঘ্রাণ, শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মিলন এবং রাষ্ট্রনীতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অপার এবং সম্মিলিত সংযোগ। সম্রাট আকবরের হাত ধরে যে ফসলি সনের সূচনা হয়েছিল, সেই একই বর্ষ আজ পহেলা বৈশাখের রূপে উদযাপিত হয়, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। বঙ্গাব্দের জন্ম কোনো উৎসবের রঙে হয়নি বরং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং প্রজার কষ্টের সুরাহা করার তাগিদেই হয়েছিল। সম্রাট আকবরের সময়কালে কৃষি অর্থনীতি ছিল সাম্রাজ্যের মূল স্তম্ভ। হিজরি সন চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে খাজনা আদায়ের দিন মিলত না। ফলে কৃষকের জন্য সেই সময়ে খাজনা দেওয়া ছিল অতিব কষ্টের।


সম্রাট আকবর কৃষকের এই দুরবস্থা বুঝতে পারেন এবং উপলব্ধি করেন একটি স্থিতিশীল সৌরবর্ষ ছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থা সুষ্ঠু হাওয়া বেশ কঠিন। তাই ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তার রাজজ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে নির্দেশ দেন একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির। সিরাজি হিন্দু সৌরবর্ষের সূর্যসিদ্ধান্ত, ইসলামিক হিজরি সন এবং আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দকে মিলিয়ে ফতেহউল্লাহ তৈরি করেন ফসলি সন। এই সনের শুরু হয় পহেলা বৈশাখ থেকে, কারণ সেই বছর হিজরি মহরমের সঙ্গে বৈশাখ মাস মিলে গিয়েছিল। এভাবেই জন্ম নেয় বঙ্গাব্দ, যা যা পরবর্তীকালে বাংলা সাল নামে পরিচিত হয়। প্রথমে এটি ছিল রাজস্ব সংগ্রহের হাতিয়ার, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি বাঙালির জীবনের সঙ্গে মিশে যায় ওতপ্রোতভাবে। এই সংস্কারের পেছনে আকবরের ছিল অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলকে একই জায়গায় এনে মেলবন্ধন তৈরি করার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা।


তারিখ-ই-ইলাহী নামে পরিচিত এই সনটি আকবরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতিফলনও বটে। পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে হালখাতার দিন। জমিদাররাও পুণ্যাহ উৎসবের আয়োজন করতেন। এই উৎসব ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পরতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতাতেই বাংলার গ্রামীণ জীবনে এটি হয়ে ওঠে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। মুঘল যুগের পর ব্রিটিশ শাসনকালে বঙ্গাব্দের ভূমিকা আরও গভীর হয়। ইংরেজরা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারকে প্রাধান্য দিলেও বাঙালিরা তাদের নিজস্ব বর্ষকে আঁকড়ে ধরেন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ১৮৬৪ সালে প্রথম আধুনিক পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। রবীন্দ্রনাথের এসো হে বৈশাখ গান আজও বাঙালির হৃদয়ে নতুন বছরকে বরণের সাথে, সকল অশুভের বিদায় করে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে ব্রিটিশ আমলে এই উৎসব হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদের অংশ। এই সময়ে বঙ্গাব্দ আর কেবল কৃষি-নির্ভর নয়, এটি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের বাহন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গাব্দের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।


পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি শাসকদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছায়ানট ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে প্রথম পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করে। এটি ছিল প্রতিরোধের প্রতীক। স্বাধীন বাংলাদেশে এই উৎসব জাতীয় ছুটির দিনে পরিণত হয়। ১৯৮৭সাল থেকে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ নির্দিষ্টভাবে ১৪ এপ্রিল পালিত হয়ে আসছে। আজকের সময় দাঁড়িয়ে এই দিনটি লোকগান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, গ্রামীণ মেলা, পান্তা-ইলিশের রীতি সবকিছু মিলে এটি হয়ে ওঠে বাঙালির সর্বস্তরের মানুষের উৎসব


এবং ধর্মনিরপেক্ষ মিলনমেলা। এই নববর্ষকে কেন্দ্র করে মঙ্গল শোভাযাত্রার রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। ইউনেস্কো একে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বৈশাখ কেবল একটি জাতীয় উৎসব নয়, এটি বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়। বাংলার গ্রামীণ আচার ও নাগরিক শিল্পরূপের এই মেলবন্ধন বিশ্বমঞ্চে বাঙালির পরিচয়কে করেছে আরও উজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ।


স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বঙ্গাব্দকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও সুসংহত করা হয়। তারিখ নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক সংশোধনও আনা হয়, যাতে ঋতুচক্রের সঙ্গে সঙ্গতি বজায় থাকে। এই সংস্কারের ফলে আজকের বাংলা ক্যালেন্ডার আরও স্থিতিশীল ও ব্যবহারিক হয়েছে। ফলে কৃষি, শিক্ষা, প্রশাসন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব ক্ষেত্রে বঙ্গাব্দের ব্যবহার সুসংহত রূপ পেয়েছে। মূলত এই সন M এক দীর্ঘ রূপান্তরের দলিল। আকবরের র প্রশাসনিক প্রয়োজন থেকে শুরু করে কৃষকের ক্যালেন্ডার, ব্যবসায়ীর হিসাবের খাতা থেকে শিল্পীর ক্যানভাস এবং সর্বসাকুল্যে জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়েছে। বৈশাখ আজ শহরের রাস্তায় শোভাযাত্রা, গ্রামের মেলায় নাগরদোলা, ঘরের পান্তাভাতে পারিবারিক মিলন, রঙিন পোশাকে নতুন প্রভাতের সূচনা। মূলত বঙ্গাব্দের প্রাণশক্তি তার অভিযোজন ক্ষমতায়। এটি সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছে, তবু মূলধারা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বৈশাখ আমাদের শেখায় সময় কেবল ঘড়ির কাঁটায় নয়, সময় মাপা হয় মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতির পরিবর্তন, সমাজের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে। বঙ্গাব্দ সেই জীবন্ত সময়পরিমাপ, যা বাংলার মানুষকে তার মাটির সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রেখেছে অনন্তকাল ধরে। পাশাপাশি বজায় রেখেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ভিত্তি। আধুনিক যুগে এসে বৈশাখ পালনের ধরন বদলেছে এবং এতে করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে কিন্তু এর মূল চেতনাটি এখনও গ্রামীণ জনপদ থেকে নগরের অলিগলি পর্যন্ত প্রবহমান।


আজ পহেলা বৈশাখ মানে কেবল উৎসব নয় বরং এটি আত্মপরিচয় রক্ষার সমন্বিত শপথ। আজকের প্রজন্ম যখন পহেলা বৈশাখে রঙিন শোভাযাত্রা করে, গান করছ, নতুন পোশাক পরে, মূলত তারা অজান্তেই বহন করে পাঁচশ বছরেরও বেশি পুরনো এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। এ সেই ধারাবাহিকতা যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্রাট আকবরের সেই কর সংস্কারের উদ্যোগ যেটি আজ একটি জাতির মহামিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং তার তেজে, গুণে এবং কার্যপরতায় পৃথিবীর ইতিহাসে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বঙ্গাব্দ কেবল অতীতের স্মারক নয়, এটি বর্তমানের পরিচয় এবং ভবিষ্যতের আলো। সম্রাট আকবর থেকে আজকের বৈশাখ পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথচলা আসলে বাঙালির জয়যাত্রারই ইতিহাস, যা আমাদের শিখিয়ে দেয় কোনো সংকট যত গভীরই হোক না কেন, নতুন সূর্যোদয় অনিবার্য এবং সেই নতুন সূর্যই হলো আমাদের চিরকালের প্রাণপ্রিয় পহেলা বৈশাখের সূচনালগ্ন।

Post a Comment

Previous Post Next Post