বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

চালের দামে নাভিশ্বাস : ভয়াবহ খাদ্য সংকটের ছায়া

 প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকা

 

প্রজ্ঞা দাস

  ০৬ এপ্রিল, ২০২৫

E Paper Click 


বাংলাদেশের চালের বাজারে নেমে এসেছে অশনিসংকেত। প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে। বাজারে প্রবেশ করলেই নিম্নবিত্তের মুখে ফুটে উঠছে হতাশার ছাপ। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের জন্য পরিবারের সব সদস্যের ভাতের চাহিদা পূরণ করাই হয়ে উঠছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। মধ্যবিত্তের অবস্থা করুণ, আর নিম্নবিত্তের জন্য বাস্তবতা এখন এক নিষ্ঠুর উপহাস। বাংলাদেশে চাল কেবল খাদ্য নয়, বরং সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রতীক।

অথচ আজ সেই চালের দাম এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। দেশের বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই সংকট লুকিয়ে ছিল, তবে সাম্প্রতিক চালের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি পরিস্থিতিকে চরমে নিয়ে গেছে। বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, সরকারের নীতি, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি মিলে এক ভয়াবহ খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে। দেশের নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এই সংকট শুধুই অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও চাল উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে সংকট তীব্র হচ্ছে। তাছাড়া কৃষকদের উৎপাদিত ধানের যথাযথ মূল্য না পাওয়ার কারণে অনেকেই ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা ভবিষ্যৎ সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে চাল আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের বাজারেও পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে ধানের মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন চালের দাম আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া চালের বাজার দীর্ঘদিন ধরে অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে।

মিল-মালিক, মজুদদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা কৌশলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মজুদ রেখে বাজারে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি করে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা চড়াদামে চাল কিনতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মনিটরিং কার্যক্রমের দুর্বলতা চালের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নিয়মিত বাজার তদারকি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে মজুদদার ও ব্যবসায়ী চক্র লাগামহীনভাবে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে দেশের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী জনগণের অবস্থা খুবই করুণ। বিশেষ করে রিকশাচালক, দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী এবং শহরের সাধারণ বাসিন্দারা গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে।

আয় বাড়ছে না, অথচ খরচের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে বাড়ছে। তাদের উপার্জনের অধিকাংশটাই চলে যাচ্ছে চাল কিনতে। বেশিরভাগ পরিবারে দেখা যাচ্ছে, তারা খাবারের তালিকা থেকে অনেক কিছু বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু চালের দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, একবেলা ভাত খাওয়ার জন্যও তাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি যদি আরো বাড়ে, তবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে চলে যেতে পারে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিসিবির মাধ্যমে নিম্নমূল্যে খাদ্য বিতরণ, খাদ্য মজুদ বৃদ্ধির ঘোষণাসহ সরকারের তরফ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে আমদানি থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে সরকার। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকে চালের দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হলেও এর ফলাফল তেমন সুদূরপ্রসারী হয়নি। কারণ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

এই অবস্থায় চালের বাজারকে স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। এছাড়া সরকারকে অবশ্যই বাজার মনিটরিং আরো শক্তিশালী করতে হবে। সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে, যেসব মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু সরকার নয় এক্ষেত্রে জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে। সিন্ডিকেটের খপ্পরে না পড়ে মজুদদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। সিন্ডিকেট ও মজুদদারদের মুখোশ পুরো জাতির সামনে উন্মোচন করতে হবে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে মজুদদাররা এমন কাজ করতে দুইবার ভাববে। পাশাপাশি সরকারকে খাদ্যশস্যের মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকরী করতে হবে। চালের সরবরাহ কমানোর জন্য যে বিশাল অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, তা নিরসন করতে হবে। কৃষকদের অধিক প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা অধিক উৎপাদন করতে পারে এবং খরচ কমাতে পারে। খাদ্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভর্তুকি প্রদান ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে এই সমস্যা কিছুটা সমাধান হতে পারে।

চালের বাজারে সরকারি উদ্যোগ ও ওএমএস কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে হবে। এটি শুধু ত্রাণ নয়, এটি জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী পদক্ষেপ হতে হবে। এই মুহূর্তে চালের বাজারের অবস্থা শুধু অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলছে না, এটি দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার সংকটের ইঙ্গিত।

সবচেয়ে বড় বিষয় খাদ্য শুধু একটি পণ্য নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই অধিকার বেহাত হচ্ছে। যারা এই সংকট তৈরি করেছে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা দরকার। সরকারকে শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং গণমাধ্যমকে সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। নইলে একসময় চাল কেবল বিত্তবানদের বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াবে, আর সাধারণ মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় নিঃশেষ হয়ে যাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

proggadas2005@gmail.com

 

Post a Comment

Previous Post Next Post