প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকা,
০৭ এপ্রিল ২০২৫
E paper Click
আধুনিক যুগে ইন্টারনেট শুধু বিলাসিতা নয়, মৌলিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুতগতির ইন্টারনেট অপরিহার্য। কিন্তু শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বিভাজন আজও প্রকট। শহুরে জনগোষ্ঠী যখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সুবিধা ভোগ করছে, তখন গ্রামীণ অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো নির্ভর করছে ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর। আবার কিছু কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠী এখনো সম্পূর্ণরূপে ইন্টারনেটের সংযোগবিহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা শুধু একটি প্রযুক্তিগত লক্ষ্য নয়, এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সমাজব্যবস্থার রূপান্তরেরও ভিত্তি।
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত বাস্তবতায় রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ছাড়া উন্নয়ন কেবলমাত্র শহরকেন্দ্রিক থেকে যাবে, ফলে বৈষম্যের এক নতুন মাত্রা তৈরি হবে যা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে। ইন্টারনেটের অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে না, কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাগুলো এখনো সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এই সংকট সমাধানের জন্য স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা প্রচলিত অপটিক্যাল ফাইবার, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ যেখানে পৌঁছাতে ব্যর্থ, সেখানে স্টারলিংকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামেও উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি আদৌ বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত সমাধান কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তি মূলত লো-আর্থ অরবিটে স্থাপিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কাজ করে, যা প্রচলিত ভূ-স্থির স্যাটেলাইট বা ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের তুলনায় দ্রুততর সংযোগ প্রদান করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে ভূগোলগত বাধাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব, যা বাংলাদেশের মতো নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলসমৃদ্ধ দেশে অত্যন্ত সহায়ক হবে।
প্রচলিত অপটিক্যাল ফাইবার কেবল বা মোবাইল টাওয়ারনির্ভর কাঠামো যেখানে ব্যর্থ হয়, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এক কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা। স্টারলিংক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের মালিকানাধীন হলেও এর কার্যক্রম এবং বিস্তৃতি সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। এটি শুধুমাত্র ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানকারী একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, বরং এক ধরনের নয়া-উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ, যার মাধ্যমে তথ্য প্রবাহ, যোগাযোগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপর পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। যদি বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে স্টারলিংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরে, তবে দেশের তথ্যপ্রবাহের ওপর স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হয়ে পরবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক তথ্যপ্রবাহ মার্কিন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পরার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যা হয়ে উঠবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ।
প্রযুক্তি যখন কোনো জাতির জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে, তখন সেটি শুধু উন্নয়নের হাতিয়ার থাকে না, বরং হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র। এছাড়া বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো তৈরির জন্য ইতোমধ্যে টেলিকম অপারেটর ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা কাজ করছে। স্টারলিংক একচেটিয়া বাজার প্রতিষ্ঠা করলে স্থানীয় টেলিকম কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ হুমকির মুখে পরবে, কর্মসংস্থান কমবে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষতি হবে। এর পাশাপাশি স্টারলিংকের অর্থনৈতিক কাঠামোও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই পরিষেবাটি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল, যা বাংলাদেশের সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সহজলভ্য নাও হতে পারে। প্রাথমিকভাবে স্বল্পমূল্যে অথবা ভর্তুকি দিয়ে এটি সরবরাহ করা হলেও, একবার বাজারে একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে সেবার খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি ডিজিটাল বিভাজন আরো বাড়িয়ে তুলবে, যা বর্তমান কাঠামো থেকেও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে এবং অর্থনীতির উপর ও সেটার প্রভাব লক্ষণীয় হবে।
তাই স্টারলিংকের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে বাংলাদেশের উচিত স্থানীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করা। যা স্বল্প খরচে দেশের অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত করা যায়। টেসলা, গুগল এবং কিছু স্টার্টআপ ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির উপর কাজ করছে। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ এলাকায় ৫এ প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানোর ব্যবস্থাও এক্ষেত্রে একটা কার্যকরী সমাধান হতে পারে। এর মাধ্যমে স্টারলিংকের তুলনায় কম খরচে, অধিকতর নিয়ন্ত্রিত ও দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর ইন্টারনেট সংযোগ তৈরি করা যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের উচিত স্থানীয় উদ্যোগগুলোর বিকাশ ঘটানো, যাতে অন্য দেশের উপর প্রযুক্তিগত নির্ভরতা হ্রাস পায় এবং জাতীয় নিরাপত্তার উপর প্রভাব না পরে।
বাংলাদেশ যদি গ্রামীণ অঞ্চলে সত্যিকারের ডিজিটাল বিপ্লব ঘটাতে চায়, তবে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। স্টারলিংক স্বল্পমেয়াদে সুবিধা দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি তথ্যনির্ভর অর্থনীতির ওপর পরাধীনতা তৈরি করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কেবলমাত্র আর্থিক বা ব্যবসায়িক বিষয় নয়, এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। প্রযুক্তিগত ক্ষমতা হারানো মানে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া। একবিংশ শতাব্দীতে প্রকৃত স্বাধীনতা মানে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এই বাস্তবতায় স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তিগত সুবিধা গ্রহণের আগে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা যায়।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
proggadas2005@gmail.com

Post a Comment