পাঠকের লেখা
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন
প্রজ্ঞা দাস
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
বর্তমান সময়ে বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত দুই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র নতুন করে পরস্পরের মুখোমুখি। মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে সময়ের বিবর্তনে নানা ধরনের শাসনব্যবস্থার উত্থান-পতন ঘটেছে। রাজতন্ত্র থেকে সামন্ততন্ত্র, উপনিবেশবাদ থেকে জাতীয়তাবাদ, সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র-সবই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে ধারণা সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, তা হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্রকে মনে করা হয়েছিল মানবমুক্তির পথ, রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও নাগরিক কবর স্বাধীনতার সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে আশাব্যঞ্জক অধ্যায়টি আজ এক করুণ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
'ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়া'র ২০২৬ সালের বৈশ্বিক গণতন্ত্রের পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ১৭৪টি দেশের মধ্যে ৯৮টিতে গণতন্ত্র আগের চেয়ে দুর্বল হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০ দেশের মধ্যে প্রায় ৬টিতে গণতন্ত্রের কোনো না কোনো দিক খারাপ হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫টি দেশে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে।
যেসব দেশে গণতান্ত্রিক অবস্থা খারাপের দিকে, সেখানে দেখা গেছে, কথা বলার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং আইনসভার কার্যকর ভূমিকা হরণ করা হয়েছে। আর গণতন্ত্রের সমস্যা শুধু স্বৈরশাসিত দেশে নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যেও তা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করা। বর্তমানে নির্বাচন হয়, সংসদ থাকে, রাজনৈতিক দলও থাকে; কিন্তু ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কমে যায়। নির্বাচিত সরকার আইন ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য কুক্ষিগত করে রাখে। ফলে গণতন্ত্রের কাঠামো অক্ষত
থাকলেও তার ভেতরের জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। হাঙ্গেরিতে নির্বাচিত সরকারের দীর্ঘমেয়াদি
সাংবিধানিক ও আইনি পরিবর্তনে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। তুরস্কে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং বিরোধী রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল করেছে। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান সরাসরি নির্বাচিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, নির্বাচিত সরকার ও কার্যকর আইনসভা-সংক্রান্ত অবনতির কথা যেভাবে উঠে এসেছে, তেমনি নাগরিক স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, দুর্নীতির অনুপস্থিতিসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতিও নথিভুক্ত হয়েছে; যা একদিকে যেমন স্বস্তির, অন্যদিকে শঙ্কারও।
গণতন্ত্রের এই ক্ষয়ের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অর্থনীতি অন্যতম। মূলত বৈষম্য, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে মানুষের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে যায়।
গণতন্ত্র কোনো স্থির অর্জন নয়, এটি প্রতিনিয়ত রক্ষা করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। কেননা একটি রাষ্ট্রের পতন দৃশ্যমান, কিন্তু গণতন্ত্রের পতন নীরব। এভাবে চলতে থাকলে ২১ শতক শেষ হওয়ার আগেই হয়তো গণতন্ত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যেতে পারে।
গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পুরো শাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধ করে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন হতে হবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য। সংসদ ও বিচারব্যবস্থাকে হতে হবে কার্যকর ও স্বাধীন। বিরোধী মতকে দমন নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা রক্ষা, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নাগরিককে শুধু ভোটার নয়, রাষ্ট্রের জবাবদিহির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিকল্প নেই। যার মাধ্যমে গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

Post a Comment