বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

নারী দিবস নিয়ে নারীদের ভাবনা

 নারী দিবস নিয়ে নারীদের ভাবনা

নারী দিবস নিয়ে নারীদের ভাবনা

সাদিয়া সুলতানা রিমি
প্রকাশ: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ২:৫৫ পিএম আপডেট: ০৭.০৩.২০২৬ ৩:৪২ পিএম

নারী দিবস নিয়ে নারীদের ভাবনা

প্রতি বছর মার্চ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে শুভেচ্ছা, ফুল এবং অনুপ্রেরণামূলক বার্তায়। অফিস, প্রতিষ্ঠান, এমনকি ঘর-বাড়িতেও নারী দিবস হয়ে ওঠে এক দিনের বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের উপলক্ষ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই উদযাপন কি সত্যিই নারীর দৈনন্দিন সংগ্রামকে প্রতিফলিত করে, নাকি কেবল প্রতীকী স্বীকৃতিতেই সীমাবদ্ধ? কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সহিংসতার ঝুঁকি, অদৃশ্য শ্রমের চাপ—এই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নারী দিবসের প্রকৃত অর্থ বোঝার সময় এসেছে। বর্তমান সময়ের তরুণরা নারী দিবসকে কীভাবে দেখে এবং মূল্যায়ন করে, সেটাই তুলে ধরেছেন সাদিয়া সুলতানা রিমি 

সমতার পথে নারীর যাত্রা: অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের স্বপ্ন 

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নারী স্বাধীনতার গল্পটি কেবল অধিকার আদায়ের নয়, বরং সমাজের সমস্ত কুসংস্কার, বাঁধা-বিপত্তি ও বাধা পেরিয়ে অদম্য সাহসে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ঘর থেকে মহাকাশ—নারীর পদচারণা আজ সর্বত্র। তবে এই যাত্রাপথ যতটা গৌরবের, ঠিক ততটাই কণ্টকাকীর্ণ। কারণ নারীদের এগিয়ে চলার পথে নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়, যার ফলে তাদের যাত্রা সংকুচিত হয়, কিন্তু আমাদের আধুনিক বিশ্বের নারীরা সেসব পিছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে তাদের নিজ গতিতে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে নারীর অবস্থানের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষা, রাজনীতি এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং বাস্তবতা। তারা প্রমাণ করেছে, নারীদের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হলে তারা বিশ্বজয় করতে পারে।

সমতার পথে নারীরা এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য, সমান মজুরি না পাওয়া, বাল্যবিবাহ ও শিক্ষাবঞ্চনা বড় সমস্যা। পারিবারিক সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানিও তাদের অগ্রগতিতে বাধা দেয়। সামাজিক কুসংস্কার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত অংশগ্রহণ সমতা অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

এই সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নারীরা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে দেশের সর্বক্ষেত্রে। আমাদের আগামীতে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আগামী দিনের স্বপ্ন হলো এমন একটি সমাজ যেখানে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ, সম্মান ও নিরাপত্তা পাবে। যেখানে প্রতিটি মেয়ে তার শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন পূরণের স্বাধীনতা পাবে, বাল্যবিবাহ বা বৈষম্যের কোনো বাধা থাকবে না। সমাজের মানসিকতা হবে সচেতন ও সমতার ভিত্তিতে গঠিত। নারী স্বাধীন ও আত্মনির্ভর হবে, আর সমতা ও সম্মানের পরিবেশে সবাই মিলে উন্নতির পথে এগোবে।


নাবিলা মেহেজাবিন 
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 

গ্রামের নারী, বদলে যাওয়া জীবন: অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব


গ্রামীণ নারীর জীবন সংগ্রাম ও সাফল্যের এক অনন্য গল্প। একসময় ঘরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও আজ তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান বদলে দিয়েছেন। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই পরিবর্তন নিঃশব্দ হলেও গভীর প্রভাব ফেলছে। গবাদিপশু পালন, সবজি চাষ, নকশিকাঁথা তৈরি, জামদানি বুনন কিংবা ছোট ব্যবসার মাধ্যমে নারীরা পরিবারে আয় বাড়াচ্ছেন। তৈরি পোশাক শিল্পেও তাদের বড় অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। শিক্ষার প্রসার, ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও কার্যক্রম নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করেছে। ফলে তারা এখন পারিবারিক সিদ্ধান্ত, সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে সামাজিক কুসংস্কার, প্রশিক্ষণের অভাব এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বাধা দূর করতে আরও সুযোগ ও সহায়তা প্রয়োজন। গ্রামীণ নারীদের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে—তারা শুধু পরিবারের সহায়ক নন, বরং দেশের অর্থনীতির এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি।
আয়শা চিশতী ফুল 
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 

ডিজিটাল যুগে নারী: সুযোগ, নিরাপত্তা ও নতুন সম্ভাবনা


এক সময় ছিল যখন মেয়েদের জীবন চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ; বাইরে কাজ করা যেন বিলাসিতার বিষয় ছিল। কিন্তু ডিজিটাল যুগে নারীদের উপস্থিতি দেশ পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কর্মসংস্থানের ভৌগোলিক বাধা দূর করেছে। এখন দক্ষতার সঠিক প্রয়োগে যে কেউ আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে। তবে অগ্রযাত্রায় যেমন আছে নতুন সম্ভাবনা, তেমনি রয়েছে সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ।

ডিজিটাল যুগে নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হলো কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ। গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট এবং কন্টেন্ট রাইটিংয়ের মাধ্যমে হাজারো নারী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন। ই-কমার্স ও উদ্যোক্তা হওয়ায় নারীদের এগিয়ে চলা এখন চোখে পড়ার মতো। গত কয়েক বছরে কয়েক লাখ নারী দেশী পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিচ্ছেন। ঘরে বসে বিদেশী কোম্পানিতে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা কাস্টমার সাপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল। তাই টিকে থাকতে হলে নির্দিষ্ট কিছু দক্ষতায় নিজেকে শাণিত করা অপরিহার্য—যেমন প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কমিউনিকেশন স্কিল, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার ইত্যাদি।

সচেতনতায় সেরা সুরক্ষা। ডিজিটাল দুনিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও বেড়েছে। হ্যাকিং, বুলিং বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি অহরহ ঘটছে। নিরাপদ থাকতে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করা জরুরি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করেছে। তবে কেবল সুযোগ থাকলেই হবে না; প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থন এবং নিরাপদ ইন্টারনেট। প্রযুক্তি হোক নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান হাতিয়ার—এটাই প্রত্যাশা নারী দিবসে। সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতায় একজন নারীকে ডিজিটাল বিশ্বের নেতৃত্বে আনা সম্ভব।
তানিয়া আক্তার
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

গৃহাস্থলী কাজে নারী অদৃশ্য অর্থনৈতিক কারিগর



নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে নারীরা সাধারণত কর্মসংস্থানে নিয়োজিত থাকে না। বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে তারা শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও বাইরে কাজ করতে পারে না। কিন্তু নারীরা গৃহে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তারা যেসব কাজ করেন, তা বাইরের কাজের থেকে কোনো অংশে কম নয়।

নারীরা বরাবরই তাদের দক্ষ হাতে বিচিত্রধর্মী কাজ করেন, যেমন—বাড়ির আঙিনায় সবজি ও ফল চাষাবাদ, হাঁস-মুরগি পালন, হস্তশিল্প, সেলাই, কারুশিল্প, মৃৎশিল্প, বিভিন্ন পণ্য তৈরি ইত্যাদি। কৃষি কাজে নারীরাই প্রথম কাজের সূচনা করে। ঘরে তৈরি খাবার বিক্রি করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান; যেমন কেক, পিঠা, আচার, মিষ্টি, হোমমেড খাবার তৈরি করে অর্ডার নেওয়া।

ফ্রিল্যান্সিং কাজের মধ্যে রয়েছে গ্রাফিক্স ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ডাটা এন্ট্রি, অনুবাদ ইত্যাদি, যেগুলো অনলাইনে আয়ের সুযোগ তৈরি করে। ইউটিউব বা কন্টেন্ট তৈরি এবং ব্লগিং বর্তমানে নারীদের ঘরে বসে অর্থ উপার্জনের শীর্ষে রয়েছে। বিউটি পার্লারের কাজে হোম সার্ভিস দেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এছাড়াও অনলাইনে কোচিংয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষার্থীরা সহজেই শিক্ষাগ্রহণ করতে পারছে।

নারীদের এই সব কাজ অনেক সময় আমাদের দৃষ্টিগোচর হলেও, তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নারীরা গৃহে বসেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। এছাড়াও তারা সংসারে যে অবদান রাখেন, তা বাইরের কাজের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আমাদের উচিত নারীর কাজকে সম্মান করা এবং নারীকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া।
আফিয়া আলম 
শিক্ষার্থী,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

নেতৃত্বে নারী: রাজনীতি, প্রশাসন ও কর্পোরেট জগতে অবস্থান


সাফল্যের চূড়ায় যখন একজন নারী পৌঁছান, পৃথিবী কেবল তার সাফল্যই দেখে। কিন্তু কেউ সাফল্যের পেছনের দুর্বিষহ সময়গুলো দেখেনা। রাজনীতি, প্রশাসন কিংবা কর্পোরেট—প্রতিটি ক্ষেত্রই একজন নারীর জন্য একেকটি রণক্ষেত্র। যেখানে কেবল যোগ্যতা দিয়ে পৌঁছানো যায় না, বরং প্রতিটি পদে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয় এক অসম লড়াইয়ে।

এই পথে নারীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজের সেই পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি, যা আজও নারীর মেধার চেয়ে তার লিঙ্গকে বড় করে দেখে। রাজনীতির মাঠে নারীর চরিত্রে কাদা ছোড়াছড়ি, প্রশাসনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অসহযোগিতা, কর্পোরেট বোর্ডরুমে নারীর কণ্ঠকে উপেক্ষা করা—এগুলো সবই তার নিত্যদিনের লড়াইয়ের অংশ।

এই পেশাদার যুদ্ধের পাশাপাশি ঘর ও সন্তান সামলানোর যে অদৃশ্য চাপ, নারী এক হাতে সামলে উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এটাই তার প্রকৃত সাফল্য। তবে নারীর সর্বোচ্চ সাফল্য সেখানেই, যেখানে নারী সব বাঁধা ডিঙিয়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হয়ে ওঠেন। তখন তা কেবল তার ব্যক্তিগত বিজয় নয়, বরং আগামীর কয়েক প্রজন্মকে বদলে দেওয়ার শক্তি।

নারীর সাফল্য মানে কেবল একটি চেয়ার জয় নয়, বরং হাজারো বাঁকা হাসিকে তুচ্ছ করে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার সেই অবিনাশী স্পর্ধায় নারী নেতৃত্বের প্রকৃত জয়গান।

প্রজ্ঞা দাস 
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

নারীর মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব সংগ্রাম থেকে সচেতনতার পথে

সমাজে নারীকে একসঙ্গে বহু পরিচয়ে বাঁচতে হয়—মেয়ে, স্ত্রী, মা, কর্মজীবী কিংবা শিক্ষার্থী। প্রতিটি ভূমিকায় তার প্রতি প্রত্যাশা অসীম, কিন্তু তার মানসিক ক্লান্তি বা ভাঙনের কথা খুব কমই শোনা যায়। সামাজিক চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে নারীর মনে তৈরি হয় অদৃশ্য এক চাপের দেয়াল।

কর্মজীবী নারীরা অফিসে দক্ষতার প্রমাণ দিতে দিতে ঘরে ফিরে আবার নিখুঁত গৃহিণীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এই দ্বৈত দায়িত্ব পালনের চাপে অনেক সময় তারা নিজের অনুভূতি, বিশ্রাম কিংবা স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে পারেন না। অন্যদিকে, গৃহিণীরাও কম চাপের মধ্যে থাকেন না; তাদের শ্রমকে প্রায়ই স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, যা আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। ফলে উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবসাদ তৈরি হতে পারে।

অথচ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনও অনেক পরিবারে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা হয়। সময় এসেছে এই নীরব সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়ার। পরিবারের সমর্থন, কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল পরিবেশ এবং খোলামেলা আলোচনা—এই তিনটি পদক্ষেপ নারীর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে। নারীর মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি সুস্থ সমাজ গঠনের ভিত্তি। নীরবতা ভাঙলেই শুরু হবে সুস্থতার পথচলা।

সুরাইয়া বিনতে হাসান 
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

স্টেরিওটাইপ ভাঙার গল্প: পেশায় ‘অপ্রচলিত’ নারীরা


সমাজ দীর্ঘদিন ধরে পেশাকে লিঙ্গভিত্তিতে ভাগ করে আসছে। যার ফলে 'মেকানিক' শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন পুরুষের প্রতিচ্ছবি। এই যে দেয়াল—যেখানে রান্নাঘর বা সেলাইয়ের কাজ কেবল নারীদের আর প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নির্মাণ বা ড্রাইভিং পুরুষের দায়িত্ব বলে গণ্য হতো আজকের নারীরা সেই দেয়াল ভেঙে ফেলেছে। আজ কোনো নারী যখন গাড়ির ইঞ্জিন খুলে সমস্যা শনাক্ত করেন, তখন তিনি কেবল একজন মেকানিক নন তিনি একটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। কোনো নারী যখন বাস, ট্রাক বা রাইড-শেয়ার গাড়ি চালান, তখন তিনি শুধু যাত্রী পৌঁছে দেন না; পৌঁছে দেন বার্তা দক্ষতার কোনো লিঙ্গ নেই। প্রযুক্তিখাতে নারীদের অংশগ্রহণও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা স্টার্টআপ পরিচালনায় নারীরা প্রমাণ করছেন, সুযোগ পেলে তারাও সমান দক্ষ, কখনো কখনো আরও উদ্ভাবনী। তবে এই যাত্রা সহজ নয়। সামাজিক কটূক্তি, সন্দেহের দৃষ্টি, নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা এবং পারিবারিক চাপ সবকিছু পেরিয়ে তাদের এগোতে হয়। অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের আস্থাও অর্জন করতে হয় দ্বিগুণ পরিশ্রমে। তবু তারা থেমে থাকেন না। কারণ তাদের পথচলা কেবল ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করার লড়াই। সমাজ এই পরিবর্তনকে প্রায় সময়ই কটূক্তির দৃষ্টিতে দেখে, অথচ এই প্রগতিশীল নারীরাই অর্থনীতির সমৃদ্ধ বাহক। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, পরিবারে আর্থিক স্থিতি আসে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য তৈরি হয়। সমাজে বৈচিত্র্য বাড়লে সৃজনশীলতাও বাড়ে—যা উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এই সচেতন যাত্রায় প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নারীকে ব্যতিক্রম হিসেবে নয়, স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে দেখা। স্টেরিওটাইপ ভাঙার প্রতিটি গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাহস সংক্রামক। একজন পথ দেখালে, অনেকেই সেই পথে হাঁটার শক্তি পায়। আর এভাবেই বদলে যায় সমাজের সংজ্ঞা, বদলে যায় ভবিষ্যৎ।

লাবনী আক্তার শিমলা
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

পরবর্তী প্রজন্মের স্বপ্ন: তরুণীদের চোখে সমতার ভবিষ্যৎ


আমরা নারী, আমরা সব পারি। কিন্তু আমাদেরকে পারতে হয় অনেক বাধার সম্মুখীন হয়ে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস বরাবরের মতোই এবারও নারীদের নিয়া আলোচনা করা হবে, তাদের কাজের প্রশংসা করবে আর তাদের সমস্যাগুলো নিয়েও কথা হবে তবে শুধুমাত্র আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে সমস্যাগুলোর সমাধানে পদক্ষেপ খুব কম-ই নেওয়া হয়। নারীদেরকে সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে, কর্মস্থলে যাওয়ার সময় পরিবহনে এবং কর্মস্থলে হয়রানিসহ প্রাপ্য সম্মান ও পারিশ্রমিকে বেষম্যের শিকার হতে হয়। বর্তমান সময়ে সব থেকে বেশি আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। দৈনিক খবরের কাগজ খুললে আমরা দেখতে পাই নারীদের হেনস্তার খবর, ধর্ষণের খবর, হত্যার খবর, যৌতুকের জন্য অত্যাচারসহ আর কত খবর!!! নারীদেরকে পেছনে ফেলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী-পুরুষের সমান কাজেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। নারী বিদ্বেষ মনোভাব দূর করতে হবে। নারী দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, এটি সচেতনতারও দিন।নারীদের প্রতি সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে কারণ তারা-পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিজ্ঞান, ক্রীড়া, সাহিত্য, রাজনীতি -সবখানেই তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে আর ভবিষ্যতেও দিবে। এত বাঁধার সম্মুখীন হয়েও যদি নারীরা এগিয়ে যেতে পারে তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে তারা কতটা না এগিয়ে যাবে!!! 

হুমায়রাত হক প্রমি 
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Post a Comment

Previous Post Next Post