নারী দিবসে তরুণীদের ভাবনা
খবরের কাগজ পত্রিকা,
০৮ মার্চ ২০২৬ ইং
ই- পেপার ভার্সন Click
প্রতিবছর মার্চ এলেই নারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে শুভেচ্ছা, ফুল আর অনুপ্রেরণামূলক বার্তায়। অফিসে, প্রতিষ্ঠানে, এমনকি ঘরেও নারী দিবস যেন একদিনের বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের উপলক্ষ। কিন্তু এই উদযাপন কি নারীর জীবনের বাস্তব সংগ্রামকে প্রতিফলিত করে, নাকি তা কেবল প্রতীকী স্বীকৃতিতেই সীমাবদ্ধ? বর্তমান সময়ের তরুণীরা নারী দিবস নিয়ে কী ভাবে, তাদের এই ভাবনা তুলে ধরেছেন সাদিয়া সুলতানা রিমি
ডিজিটাল যুগে নারীর পদার্পণ
তানিয়া আক্তার শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
এক সময় নারীদের জীবন ছিল চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সেই সীমা ভেঙে নারীরা বিশ্বজুড়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট রাইটিং ও ই-কমার্সে যুক্ত হয়ে অনেক নারী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসছেন। ঘরে বসেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শেখা জরুরি। সঠিক শিক্ষা, পারিবারিক সমর্থন ও নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত হলে প্রযুক্তি নারীর ক্ষমতায়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।
সমতার পথে নারীর যাত্রা
নাবিলা মেহেজাবিন শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
একবিংশ শতাব্দীতে নারী স্বাধীনতার গল্প কেবল অধিকার আদায়ের নয়, বরং সমাজের কুসংস্কার, বাধা ও চার দেয়ালের সীমা পেরিয়ে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। আজ ঘর থেকে মহাকাশ- নারীর পদচারণা সর্বত্র। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে শিক্ষা, রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবে লিঙ্গবৈষম্য, সমান মজুরি না পাওয়া, বাল্যবিবাহ, শিক্ষাবঞ্চনা, পারিবারিক সহিংসতা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বাধা সত্ত্বেও নারীরা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলেছে। ভবিষ্যতের স্বপ্ন এমন একটি সমাজ, যেখানে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ, সম্মান ও নিরাপত্তা পাবে এবং প্রতিটি মেয়ে স্বাধীনভাবে শিক্ষা ও স্বপ্নপূরণের সুযোগ পাবে।
নীরব সংগ্রাম থেকে সচেতনতার পথে
সুরাইয়া বিনতে হাসান শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সমাজে নারীকে এক সঙ্গে বহু পরিচয়ে বাঁচতে হয়- মেয়ে, স্ত্রী, মা, কর্মজীবী বা শিক্ষার্থী। প্রতিটি ভূমিকায় তার প্রতি প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু তার মানসিক ক্লান্তির কথা খুব কমই শোনা হয়। কর্মজীবী নারীরা অফিসের দায়িত্ব শেষে ঘরে ফিরে আবার গৃহিণীর কাজ সামলান। আর গৃহিণীদের শ্রম তো স্বীকৃতিই পায় না। ফলে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক অবসাদ তৈরি হতে পারে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনো অনেক পরিবারে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। তাই নারীর এই নীরব সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। পারিবারিক সমর্থন, সহানুভূতিশীল কর্মপরিবেশ ও খোলামেলা আলোচনা নারীর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে, যা একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাফল্য
মমতা
নেতৃত্বে নারীর অবস্থান
প্রজ্ঞা দাস শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছালে পৃথিবী একজন নারীর অর্জন দেখে, কিন্তু পেছনের সংগ্রাম দেখে না। রাজনীতি, প্রশাসন ও করপোরেট-প্রতিটি ক্ষেত্রই নারীর জন্য একেকটি রণক্ষেত্র, যেখানে যোগ্যতার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়। সমাজের পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র হনন, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও কর্মক্ষেত্রে উপেক্ষা নারীর বড় বাধা। এর পাশাপাশি ঘর-সংসার ও সন্তানের দায়িত্বও সামলাতে হয় তাকে। তবুও সব বাধা পেরিয়ে যখন একজন নারী নেতৃত্বের আসনে পৌঁছান, তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথও বদলে দেয়। তাই নারীর সাফল্য মানে শুধু একটি পদ জয় নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও সাহস নিয়ে টিকে থাকার বিজয়গাথা।
কর্মজীবি সহানুভূতি
জাতিসংঘের নারী দিবস
নারী দিবস-নারী আমাদের গর্ব, শক্তি ও অনুপ্রেরণা
তরুণীদের চোখে সমতার ভবিষ্যৎ
হুমায়রাত হক প্রমি দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
নারীরা অনেক বাধা পেরিয়ে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাদের সাফল্য ও সমস্যার কথা আলোচনা হলেও বাস্তবে সমাধানের উদ্যোগ খুব কম দেখা যায়। প্রতিদিন ঘর থেকে কর্মস্থল পর্যন্ত পথে নারীরা হয়রানি, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন। সংবাদপত্র খুললেই নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা বা যৌতুকের জন্য অত্যাচারের খবর দেখা যায়। অথচ নারীকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণেই সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। তাই নারীবিদ্বেষী মনোভাব দূর করে তাদের নিরাপত্তা, সম্মান ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে নারীরা আরও বেশি অবদান রেখে সমাজ ও দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারবেন।
গ্রামের নারী, বদলে যাওয়া জীবন
আয়শা চিশতী ফুল শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
গ্রামীণ নারীর জীবন সংগ্রাম আর সাফল্যের এক অনন্য গল্প। এক সময় ঘরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, আজ তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে নিজেদের অবস্থান বদলে দিয়েছে। গবাদিপশু পালন, সবজি চাষ, নকশিকাঁথা তৈরি, জামদানি বুনন কিংবা ছোট ব্যবসার মাধ্যমে নারীরা পরিবারে আয় বাড়াচ্ছেন। তৈরি পোশাকশিল্পেও তাদের বড় অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। শিক্ষার প্রসার নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করেছে। ফলে তারা এখন পারিবারিক সিদ্ধান্ত, সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে সামাজিক কুসংস্কার, প্রশিক্ষণের অভাব এবং পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বাধা দূর করতে প্রয়োজন আরও সুযোগ ও সহায়তা।
Post a Comment