বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

জলবায়ু রাজনীতি : উন্নত দেশ বনাম উন্নয়নশীল বিশ্ব

 জলবায়ু রাজনীতি : উন্নত দেশ বনাম উন্নয়নশীল বিশ্ব

প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকা,

 ১০ মার্চ ২০২৬ ইং 
 ই- পেপার ভার্সন  Click
 দৃষ্টিপাত


প্রজ্ঞা দাস


জলবায়ু রাজনীতি : উন্নত দেশ বনাম উন্নয়নশীল বিশ্ব


বজলবায়ু র্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন। দাবানল, অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ বিধ্বস্ত, অস্বাভাবিক মাত্রায় গরম হয়ে উঠছে পৃথিবী। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকি যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতির গতিশীলতাকে ক্রমশ প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি। উন্নত দেশগুলোর শতাব্দীজুড়ে শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট কার্বন নির্গমন আজ পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, অথচ সেই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপর। ফলে জলবায়ু সংকট ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লায়। বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে জলবায়ু এখন এক নতুন শক্তির খেলা। এখানে কেবল পরিবেশ রক্ষার আলোচনা নয়, বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, উন্নয়ন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও চলছে কঠিন দরকষাকষি।


উন্নত দেশগুলো যেখানে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য রক্ষার কৌশল খুঁজছে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো লড়াই করছে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।? ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, উনবিংশ শতাব্দী থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় শিল্প বিপ্লবের ফলে ব্যাপক হারে কয়লা, তেল ও গ্যাস ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হতে থাকে। গ্লোবাল কার্বন বাজেটের সর্বশেষ হিসাবে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র একাই প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলিয়ে উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক অবদান ৫০ শতাংশেরও বেশি। চীন এখন বার্ষিক নির্গমনে সবচেয়ে বেশি, কিন্তু তার ঐতিহাসিক অংশ অনেক কম। ভারত, বাংলাদেশ বা আফ্রিকার দেশগুলোর যোগফল ১০ শতাংশেরও কম।


উন্নত দেশগুলো কয়লা-তেল পুড়িয়ে শিল্পায়িত হয়েছে যখন, তখন আমাদের মতো দেশগুলো ছিল উপনিবেশ বা কৃষিপ্রধান। অথচ এখন এই উন্নত দেশগুলোই সবাইকে সমান দায়িত্ব নেবার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। যেন একজনের বোঝা আর একজনের ওপর চাপিয়ে


জলবায়ু দেওয়া হচ্ছে। রিও সম্মেলন থেকে প্যারিস চুক্তি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা হয়েছে, নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণীব্যবস্থা। কিন্তু সেগুলো শুধুমাত্র কাগজে কলমেই পড়ে আছে। উন্নত দেশগুলোও নিজেদের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বেশ আরমম্বরেই আছে। প্যারিস চুক্তি (২০১৫) অনুযায়ী কথা ছিল প্রতিটি দেশ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এনডিসি প্রদান করবে। উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা অর্থ ও প্রযুক্তি দিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করবে। কিন্তু ২০২৫-২০২৬ সালে নতুন এনডিসি জমা দেওয়ার পরও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক নির্গমন ২০১৯ সালের তুলনায় মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ কমবে। এর অর্থ পৃথিবী এখনো প্রায় ২.৩ থেকে ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে, যা মানবসভ্যতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। জলবায়ু অর্থায়ন নিয়েও একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে।


সর্বশেষ জলবায়ু সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার সরকারি অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সব মিলিয়ে প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহের কথা বলা হলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থও অনেক কম। বিশেষ করে অভিযোজন ও জলবায়ু বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ তহবিল এখনো খুব সীমিত। তার ওপর যে অর্থ আসছে তার বড় অংশই ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, ফলে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের বোঝা আরো বাড়ছে। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর দ্বিচারিতার বিষয়টিও বেশ লক্ষণীয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার ট্যাক্স নীতি অনুযায়ী যেসব দেশে উৎপাদনের সময় বেশি কার্বন নির্গমন হয়, তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। কিন্তু এর বাস্তবতায় এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেখা যায় না। এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। তবু বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য উন্নত দেশগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। তাদের কর্পোরেট লবি ও তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো


ব্যবসা চালিয়ে যেতে চায়, ফলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় জীবাশ্ম জ্বালানি দ্রুত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বলা হচ্ছে তারাও নির্গমন


কমাক। কিন্তু বাস্তবতা হলো মাথাপিছু কার্বন নির্গমন উন্নত দেশগুলোতে যেখানে বছরে ১০-১৫ টন, সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশে তা মাত্র প্রায় ০.৫ টন। এই বৈষম্যই আজকের জলবায়ু রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং ন্যায়সঙ্গত নীতি। উন্নত দেশগুলোর উচিত তাদের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া। জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো, প্রযুক্তি স্থানান্তর সহজ করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করাও অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও নিজেদের উন্নয়ন কৌশলকে টেকসই পথে পরিচালিত করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দেওয়ার বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই ক্ষেত্রে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং কমিউনিটি ভিত্তিক অভিযোজন কর্মসূচির মতো কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে এবং এই মাত্রা আরো বাড়াতে হবে। পৃথিবীতেও এর আগে অনেক সংকট এসেছে, কিন্তু মানুষ প্রতিবারই সহযোগিতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সেই সংকট মোকাবিলা করেছে। জলবায়ু সংকটও তার ব্যতিক্রম নয়। জলবায়ুর সংকট সর্বজনীন। কালকে একযোগে কাজ করতে হবে। সহনশীলতার বিকল্প নেই এই পরিস্থিতিতে। জলবায়ু কিংবা পৃথিবী কোনো একক ব্যক্তি কিংবা দেশের নয়, তা সামগ্রিক। পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেও এর প্রভাব বিদ্যমান নয় এ প্রভাব সামগ্রিকভাবে বিদ্যমান। তাই আগামীর জলবায়ুর গতিপথ নির্ধারণে উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী হিসেবে কাজ করতে হবে। তবেই জলবায়ুর সংকট নিরসন হবে এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।


লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ


proggadas2005@gmail.com



Post a Comment

Previous Post Next Post