প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকা
৮ ই মে ২০২৫
ই পেপার লিংক
নারীবাদ এবং পুরুষবিদ্বেষ এই দুটি ধারণার মধ্যকার সংঘাত আধুনিক সমাজে এক বিষাক্ত বিভেদের জন্ম দিয়েছে, যা জাতির সামাজিক ঐক্য, নৈতিক মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নারীবাদ ঐতিহাসিকভাবে নারীর সমানাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে। তবে নারীবাদ বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে পুরুষবিদ্বেষের ছায়ায় বিকৃত হয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে ও নারীবাদের মূল আদর্শকে কলুষিত করছে। এই ভারসাম্যহীন সংঘাত সমাজকে বিভক্ত করছে, জাতিকে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং নৈতিকতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
উনবিংশ শতাব্দীতে ভোটাধিকার আন্দোলন, বিংশ শতাব্দীতে কর্মক্ষেত্রে সমান বেতনের দাবি এবং একবিংশ শতাব্দীতে বৈচিত্র্যময় নারী অধিকারের লড়াই নারীবাদের মূল স্তম্ভ। এই আন্দোলন সমাজে নারীর অবস্থান উন্নত করেছে, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। কিন্তু নারীবাদের এই মহৎ আদর্শ কিছু ক্ষেত্রে ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। কিছু নারীবাদী পুরুষদের সামগ্রিকভাবে নারীর দুর্দশার জন্য দায়ী করে অযৌক্তিক ক্রোধ প্রকাশ করেছেন। এই বিচ্যুতি নারীবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করছে এবং সমাজে লিঙ্গের মধ্যে শত্রুতা বাড়াচ্ছে। নারীবাদের নামে পুরুষদের প্রতি অবজ্ঞা সমতার লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে পুরুষবিদ্বেষ মূলত একটি মনোভাব, যা একটি গোটা লিঙ্গের প্রতি অবজ্ঞা ও ঘৃণাকে উৎসাহ দেয়। যা এক ধরনের নিরব সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। এমন একটি মনোভাব গড়ে উঠছে, যেখানে পুরুষদের কোনো ব্যক্তিগত আচরণ বা মনুষ্যত্ব নয়, বরং তাদের লিঙ্গ পরিচয়ই যেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলত, সমাজে নারীবাদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলন তার নিজস্ব নৈতিক অবস্থান হারাচ্ছে। এই ভারসাম্যহীন লড়াই কেবল একটি তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির যে সুতো সমাজকে একত্রে বেঁধে রেখেছিল, তা ক্রমেই ছিঁড়ে যাচ্ছে। লিঙ্গভিত্তিক বিভেদ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নারীবাদ পুরুষবিদ্বেষে পর্যবসিত হচ্ছে। ফলে পুরুষ সমাজ আত্মরক্ষামূলক বিদ্রোহ গড়ে তুলছে এবং সমাজে সংঘাতময় পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জাতীয় পর্যায়ে এর প্রভাব আরো গভীর।
নারীর অগ্রগতি যেমন একটি জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পুরুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য। কিন্তু যখন এই দুই শক্তির মধ্যে অবিশ্বাস, প্রতিযোগিতা এবং প্রতিহিংসা তৈরি হয় তখন জাতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের মধ্যে বিশ্বাসহীনতা, পরিবারে সহানুভূতির অভাব, শিক্ষাঙ্গনে বিভাজন এসব মিলিয়ে একটি জাতি তার মানবসম্পদের বৃহত্তর সম্ভাবনাকে নিজেদের হাতে ধ্বংস করছে। এই ধরনের সামাজিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে দুর্বল করে, সংস্কৃতিকে ক্ষয় করে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থানকে সংকটাপন্ন করে তোলে। এই সংঘাতের আরো ভয়াবহ দিক হলো এর নৈতিক অবক্ষয়। সহনশীলতা, সমতা, ন্যায় ও সহমর্মিতার মতো মানবিক মূল্যবোধ আজকে প্রতিহিংসা পরায়ণ দৃষ্টিভঙ্গির কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে ভাবনার বিষয় হলো সমাজের এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
শিশুরা বেড়ে উঠছে এক বিভক্ত সমাজে। যেখানে তাদের শেখানো হচ্ছে লিঙ্গ একটি ক্ষমতার প্রতীক, আর সেই ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত আছে নিরন্তর সংঘাত। ছেলে শিশুরা অপরাধবোধ নিয়ে বড় হচ্ছে, মেয়ে শিশুরা প্রতিযোগিতার চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠছে। যেখানে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা অনুপস্থিত। এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম এক অনিরাপদ, বিষাক্ত সামাজিক বাস্তবতার শিকার হবে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ গঠনের ক্ষমতাকে বিনষ্ট করবে। এই বিভেদের শেকড় গভীরে নিহিত। দীর্ঘদিনের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো নারীর প্রতি যে বৈষম্য করেছে, তার প্রতিক্রিয়া কিছু নারীর মধ্যে পুরুষদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি যুক্তি ও ন্যায়বিচারের পথে না গিয়ে প্রতিহিংসার রূপ নেয়, তবে তা আরো একটি বৈষম্যকেই জন্ম দেয়। সামাজিক মাধ্যম এক্ষেত্রে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে। উত্তেজক ও বিভ্রান্তিকর বার্তা প্রচার করে এটি জনমনে বিদ্বেষ ছড়াতে সহায়তা করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের চিরায়ত সাধারণীকরণ প্রবণতা, যা দুই-একটি অভিজ্ঞতাকে পুরো লিঙ্গের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এসব মিলে তৈরি হচ্ছে একটি অসম, অনৈতিক এবং বিষাক্ত সমাজব্যবস্থা। তবে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে সমতার ভাষা শিখি, ঘৃণার পরিবর্তে সংলাপের পথ খুলি, আত্মসমালোচনা ও নৈতিক পুনর্গঠন করি তবেই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
পাশাপাশি নারীবাদকে তার মূল লক্ষ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। সমতা, ন্যায় এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে নারীবাদকে আপসহীন হতে হবে। পুরুষদের এই আন্দোলনের সহযাত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে সংলাপের আহ্বান জানানো যেতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়তে হবে। যাতে নতুন প্রজন্ম বিভক্তির নয়, ঐক্যের শিক্ষা পায়। আমাদের প্রয়োজন একটি আন্তরিক ও যুক্তিনির্ভর সামাজিক সংলাপ। যেখানে নারীর কষ্ট উপহাস নয়, আবার পুরুষের দুর্দশা অবহেলা নয়। যেখানে লিঙ্গ নয়, ব্যক্তি হয়ে ওঠে বিচার্য। নারী ও পুরুষ উভয়কেই বুঝতে হবে, পিতৃতন্ত্র যেমন নারীর জন্য ক্ষতিকর, তেমনি এটি পুরুষের প্রতিও চাপিয়ে দেওয়াও অনুচিত। সামাজিক মাধ্যমকে এবিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শেখাতে হবে সমতার মূল্যবোধ এবং পরিবারের ভিতরেই শেখাতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা। এই সংঘাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলে শুধু আজকের সমাজ নয়, আগামী দিনের সভ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
proggadas2005@gmail.com

Post a Comment