বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

রেমিট্যান্সে ভরসা, প্রবাসীরা বঞ্চিত: বৈদেশিক অর্থনীতির নৈতিক দুর্বলতা প্রজ্ঞা দাস: প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫, ৪:৩৮ পিএম

 দৈনিক ডেল্টা টাইমস নিউজ,

প্রজ্ঞা দাস:
 
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৫, ৪:৩৮ পিএম 

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে প্রবাসী শ্রমিকদের ঘামঝরা উপার্জনে—রেমিট্যান্সে। মরুপ্রান্তরে, নির্মাণসাইটে, কিংবা দীর্ঘ অমানবিক শ্রমঘণ্টার পেষণে তারা গড়ে তোলেন স্বপ্নের ভিত্তি। দেশের রিজার্ভ সমৃদ্ধ হয়, রপ্তানি ঘাটতি মেটানো সম্ভব হয়, গ্রামে গ্রামে জ্বলে ওঠে আশার আলো। অথচ এই মানুষগুলোর গল্প রাষ্ট্রের ভাষণে অনুপস্থিত, নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় তাদের নিত্যদিনের বঞ্চনা।

বৈদেশিক মুদ্রার টানাপোড়েনে যখন অর্থনীতি টালমাটাল, তখন তাদের বলা হয় ‘দেশের রক্ষাকবচ’। কিন্তু যখন তারা বিদেশের মাটিতে নিপীড়নের শিকার হন, নিঃস্ব হন, বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, তখন রাষ্ট্র নীরব। দেশে ফিরে এসেও তারা হন প্রান্তিক, অধিকারহীন। এই বৈষম্য শুধু রাজনৈতিক নয়—এটি আমাদের বৈদেশিক অর্থনীতির নৈতিক দুর্বলতা ও নির্মম বাস্তবতা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ বৈদেশিক রিজার্ভে স্বস্তি এনেছে। অথচ এই রেমিট্যান্সের নায়করা থেকে যান রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরে। প্রবাসী শ্রমিকরা শুধু অর্থই নয়, দেন সামাজিক আত্মত্যাগ—পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন, অনিরাপদ শ্রম, এবং অমানবিক 'কাফালা' ব্যবস্থার জালে আটকে পড়া অসংখ্য স্বপ্ন।

অনেকেই বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিদেশে পাড়ি জমান, পড়েন দালাল ও নিয়োগদাতার ফাঁদে। চিকিৎসা, পারিশ্রমিক, এমনকি দেশে ফেরাও নির্ভর করে মালিকের ইচ্ছায়। বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। চিকিৎসার অনুরোধ, লাশ ফেরত আনার আবেদন হারিয়ে যায় ফাইলের স্তূপে। প্রতিদিন প্লাস্টিকে মোড়ানো লাশ ফেরে দেশে—ছেলে হারা এক মা, বিধবা স্ত্রী, অথবা এক শিশু চিরতরে শূন্য হয়ে যায়।

তবু, এদের জন্য নেই কোনো শক্তিশালী কল্যাণ কাঠামো—নেই সর্বজনীন বিমা, নেই নিরাপদ বিনিয়োগ কাঠামো কিংবা আইনি সহায়তা। প্রবাসী কল্যাণ তহবিলে প্রতিবছর জমা হয় ৫০০ কোটি টাকার বেশি, অথচ এই অর্থ ব্যয় হয় মন্ত্রণালয়ের সেমিনার, বিদেশ সফর বা উন্নয়ন খাতে। মূল অংশ ভোগ করে প্রশাসনিক সুবিধাভোগীরা।

ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে সরকার ২.৫% প্রণোদনা দেয়—কিন্তু সেটিও পায় না অনেকে। দুর্নীতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আর ব্যাংকিং জটিলতায় উপার্জনের বড় অংশ হারিয়ে যায়। দেশে ফিরে প্রবাসীরা সামাজিকভাবেও অনেক সময় 'বহিরাগত' হিসেবে চিহ্নিত হন। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নেই, রাজনীতিতে নেই তাদের কণ্ঠস্বর।

এই অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। এক নির্মম অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে—যেখানে শ্রমিকরা শুধু অর্থ দেন, কিন্তু কোনো সম্মান, সুরক্ষা কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান না।

সমাধান কী? প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, মানবিক ও সুশাসনভিত্তিক পরিকল্পনা। প্রবাসীদের জন্য থাকতে হবে সর্বজনীন বিমা, পেনশন ও পুনর্বাসন সুবিধা। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও বোর্ডকে পুনর্গঠন করে দুর্নীতিমুক্ত ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হবে। দূতাবাসগুলোকে করতে হবে জবাবদিহিমূলক। প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের ব্যয় হতে হবে স্বচ্ছ এবং সরাসরি প্রবাসীকল্যাণে। দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য তৈরি করতে হবে টেকসই কর্মসংস্থান প্রকল্প। দিতে হবে পূর্ণ ভোটাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা।

রেমিট্যান্স শুধু ডলার নয়—এটি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ, এবং রাষ্ট্রের প্রতি এক নীরব আস্থা। সেই আস্থাকে মর্যাদা দিতে না পারলে, আমরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, নৈতিকভাবেও দেউলিয়া হয়ে পড়ব।

প্রবাসীরা আর বঞ্চিত না হোক। তাদের ঘামে ভেজা টাকায় গড়া হোক নতুন এক রাষ্ট্র—যেখানে থাকবে মর্যাদা, সুরক্ষা এবং ভালোবাসা।



লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর
 

Post a Comment

Previous Post Next Post