বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন
Online শপিং করুন এখন [Packly] তে এখানেই click করুন

পান্তা-ইলিশের কৃত্রিমতা ও বাণিজ্যিকতা বনাম বাস্তব ঐতিহ্য

 দৈনিক ডেল্টা টাইমস নিউজ,

পান্তা-ইলিশের কৃত্রিমতা ও বাণিজ্যিকতা বনাম বাস্তব ঐতিহ্য
প্রজ্ঞা দাস:
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৫, ১:৩২ পিএম 
 

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে আজকাল পান্তা-ইলিশের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নববর্ষ এলেই শহরের বিলবোর্ডে, টেলিভিশনের পর্দায়, রেস্টুরেন্টের মেনুতে, এমনকি অফিস-আদালতের উৎসবসূচিতে উঠে আসে একটিই জোড়া শব্দ “পান্তা-ইলিশ”। সে যেন নববর্ষের এক জাতীয় খাবার, নববর্ষ উদযাপনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। দাম হোক না চার অঙ্কে, কৃত্রিম সংকট তৈরি হোক না বাজারে, কেউ যেন হার মানতে চায় না এই ‘ঐতিহ্য’ রক্ষার প্রতিযোগিতায়। কিন্তু এই পান্তা-ইলিশ কি আদৌ বাঙালির নববর্ষের চিরায়ত ঐতিহ্য, নাকি এটি কেবলই এক মিডিয়া-নির্ভর, পুঁজিবাদী সংস্কৃতির রূপ সেটা নিয়ে দ্বিমত আছে। নববর্ষ মানে বাঙালির শেকড়ের দিকে ফিরে তাকানো। অথচ সেই উৎসবেই যদি ইতিহাস ও সংস্কৃতির অপব্যাখ্যা হয়, তবে সেটি কীভাবে সময়ের ব্যবধানে স্বমর্যাদায় টিকে থাকবে। তাই দরকার সত্যকে খুঁজে দেখা, পান্তা-ইলিশ কি আদৌ আমাদের নববর্ষের অঙ্গ ছিল, নাকি বর্তমান বাণিজ্যিক সমাজব্যবস্থার তৈরি করা এক চক্র।

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস মূলত মুঘল আমলে রাজস্বসংগ্রহকে ঘিরে। সম্রাট আকবরের সময় থেকেই বাংলা সন গণনার প্রচলন হয় কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের সুবিধার্থে। জমিদাররা এই দিনে ‘পুণ্যাহ’ নামক উৎসব করতেন, যেখানে প্রজারা রাজস্ব পরিশোধ করত ও মিষ্টিমুখ করত। প্রামাণ্য ইতিহাসে কোথাও পান্তা-ইলিশের উপস্থিতি নেই। উল্টো এই দিনটি ছিল কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিক ভারমুক্তির ও আনন্দের উপলক্ষ্য। এই দিনে তাঁরা নতুন জামা পরতেন, মিষ্টি খেতেন, গানের আসর হতো, যাত্রাপালার আয়োজন থাকত। তবে পান্তা ভাতের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক নতুন নয়। গ্রামবাংলার কৃষিজীবী সমাজে পান্তা ভাত ছিল সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্য। রাতের থেকে যাওয়া ভাত পানিতে ভিজিয়ে রাখলে সকালে তা হালকা টক স্বাদের হয়ে যেত, যা গরমের দিনে শীতলতা দিত। পান্তা ভাতের সঙ্গে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, লবণ ও ভর্তা মিলিয়ে খাওয়া হতো। এটি ছিল সস্তা, পুষ্টিকর এবং শ্রমজীবী মানুষের শক্তিদায়ক খাবার। তবে পান্তা ভাত কখনোই উৎসব বা বিশেষ দিনের খাবার ছিল না। বরং এটি ছিল দরিদ্র কৃষক ও মজুরদের বাধ্যতামূলক খাদ্য, কারণ তাদের কাছে প্রতিদিন গরম ভাত জোটে না। অন্যদিকে বাংলা বছরের প্রথম দিনে স্বাভাবিকভাবে ইলিশ পাওয়া যায় না। তখন নদীতে ডিম ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে অতীতে বৈশাখের প্রথম দিনে ইলিশ খাওয়ার প্রচলন ছিল না। অর্থাৎ নববর্ষ মানেই পান্তা-ইলিশ এটা ইতিহাস বা লোকসংস্কৃতির নিরিখে একেবারেই ভিত্তিহীন। এটি মূলত মিডিয়া, বিপণন আর কর্পোরেট রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতির এক যৌথ সৃষ্টি।নববর্ষকে ঘিরে পান্তা-ইলিশের যুগলবন্দি মূলত জনপ্রিয় হয় ২০০০ সালের পর, যখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বাংলা নববর্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করতে শুরু করে। এরপর তার সাথে যুক্ত হয় কর্পোরেট স্পন্সর, রেস্টুরেন্টের প্রমোশন, বুটিক হাউসের ডিসকাউন্ট আর ফেসবুকের ‘ট্রেন্ড’। 

অচিরেই নববর্ষের অন্যতম ‘ফ্যাশনেবল’ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে পান্তা-ইলিশ।একদিকে বাসি ভাতকে “ঐতিহ্য” বলছি, অন্যদিকে দামি ইলিশের মাধ্যমে এটিকে ‘স্মার্ট’ খাবারে রূপান্তর করছি। ফলত, খাঁটি ঐতিহ্য নয়, বরং ভ্রান্ত ধারনা ও ছদ্ম-ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠা করছি। পাশাপাশি এই ভ্রান্ত ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে বেড়ানো আমাদের খাদ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেননা এই সময় ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুম হওয়ায় ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা উচিত, কিন্তু অতিরিক্ত বাণিজ্যিক চাপে জেলেরা বাধ্য হন এই সময় মাছ ধরতে। এতে ভবিষ্যৎ ইলিশ প্রজন্ম হুমকির মুখে পড়ে। পান্তা-ইলিশ উৎসব তাই শুধু ঐতিহ্যবিরোধী নয়, পরিবেশ-অবজ্ঞাকারীও বটে। আমাদের বাঙালির আসল বৈশাখী ঐতিহ্য হালখাতা, বৈশাখী মেলা , বৈশাখী বাংলা গান, বাউল গান, পালা পার্বন ও মিষ্টিমুখে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বৈশাখী অনুষ্ঠান বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা ও ফটোসেশনেই বন্দী হয়ে গিয়েছে।আসল সংস্কৃতি কখনোই বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ ছিল না। সেটা ছিল হৃদয়ের ভেতরের অনুভব, লোকজ বিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্যের প্রকাশ। আজ সেই অনুভব হারিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে প্লেটভর্তি ইলিশ-পান্তার 'সেলফি' সংস্কৃতি। এই সকল লোক দেখানো অপসংস্কৃতি বাদ দিয়ে আমাদের আসল ঐতিহ্য এবং আমাদের বাঙালি চেতনার পুনরুদ্ধার ঘটাতে হবে। সত্যকে তুলে ধরতে হবে । সন্তানদের শেখাতে হবে যে নববর্ষ মানে শুধু খাওয়া নয়, তা হলো ইতিহাস জানার একটি প্রয়াস, শিকড়ের দিকে ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ। নববর্ষে কেন পান্তা-ইলিশ নয়, তা বোঝাতে হবে যুক্তি দিয়ে, আমাদের আসল বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরে, আবেগ দিয়ে নয়। এই সময় ইলিশ খেলে প্রকৃতির ক্ষতি হয়, দরিদ্র মানুষ ইলিশ কিনতে পারে না এই মানবিক এবং বাস্তব সত্য ও বোঝাতে হবে । এটি আমাদের সংস্কৃতির বিকৃত প্রতিচ্ছবি। নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ দিতে হবে সকলে মিলে একসঙ্গে আনন্দ করার জন্য। 

বাংলা গান, লোকশিল্প, সাহিত্য পাঠ এবং বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতিফলন কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। শহরের ভেতরে ছোট ছোট বৈশাখী আসরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কবিতা পাঠ, লোকসংগীত, আলপনা আঁকা, বাউল গানের চর্চা হোক দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায়। হোক স্কুলে-কলেজে হালখাতার প্রতীকী আয়োজন। তবেই তো সকলে আমাদের বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে আরো জানতে ও বুঝতে পারবে, সত্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। বাঙালির ঐতিহ্য হঠাৎ তৈরি হয়নি, এটি বহুকালের সংগ্রাম, যাপন, সংকট আর আনন্দের সংমিশ্রণ। সেটিকে ছোট করে দেখানো কিংবা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা আমাদের আত্মপরিচয়কেই অবমাননা করা। পান্তা-ইলিশ এক প্রকারের ‘খাবারের ব্র্যান্ডিং’, যার মাধ্যমে ভোক্তার আবেগকে পুঁজি করা হচ্ছে। এটি কোনো সমস্যা নয়, যদি তা সত্যিকার ইতিহাস বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে হতো। কিন্তু বাস্তবতা বলছে এটি ঐতিহ্যের নামে বিভ্রান্তি ও অতিরিক্ত ভোগের এক করুণ প্রকাশ। নববর্ষ হোক নতুন আলোয় পুরনোকে জানার, শিকড়কে খোঁজার, আর সত্যিকারের ঐতিহ্যকে বরণ করার উপলক্ষ। নববর্ষের আসল ঐতিহ্যকে ধারণ করা প্রতিটি বিবেকবান নাগরিকের করণীয় হওয়া উচিত। নববর্ষ পান্তা-ইলিশ নয়, হোক বাঙালির পরিচয়ের সত্য চিত্র ফুটিয়ে তোলার দিন। তবেই তো বাঙালির সংস্কৃতি দেশ ছাপিয়ে বর্হিবিশ্বের দরবারে সমাদৃত দিতে হবে।


লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।


ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই

Post a Comment

Previous Post Next Post