প্রজ্ঞা দাস:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১২:৪৮ পিএম আপডেট: ১৮.০২.২০২৫ ১২:৫১ পিএম
দৈনিক ডেল্টা টাইমস নিউজ,E Paper Click Here
বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট ও কৃষি বিপণন চ্যালেঞ্জ বর্তমানে একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। বাংলাদেশ, যা কৃষিনির্ভর দেশ, সে দেশেও কৃষিখাত নানা সংকটের সম্মুখীন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদা ৬০% বৃদ্ধি পাবে, অথচ উৎপাদনশীলতা সেই হারে বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি জমির সংকোচন, কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নানা সমস্যা এবং কৃষি বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য।
তবে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন কৃষকরা ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষও খাদ্য সংকটে ভুগছেন। বাংলাদেশ, যা ভৌগলিক কারণে প্রায়ই বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়, সেখানে এই সংকটের প্রভাব আরও মারাত্মক হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ৩০% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অসম বৃষ্টিপাত এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি দ্রুত কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৭৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় ২১% আবাদি জমি কমে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
একদিকে, কৃষির মূল উপকরণ সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারের দাম গত পাঁচ বছরে ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃষকদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য উৎপাদন কমার পেছনে এটি বড় ভূমিকা পালন করছে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য উৎপন্ন হয়, সেটিও পরিবহন, সংরক্ষণ এবং পণ্য প্রক্রিয়াকরণে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় কৃষিপণ্যের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে খাদ্যের চাহিদা পূরণে একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। কৃষি অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ২০-২৫% সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়, যার মধ্যে পচনশীল পণ্য (টমেটো, আলু, ফলমূল) সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা মাত্র ১৯ লাখ টন, যা দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
কৃষি উৎপাদন এবং বিপণনে যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি ভোগায় সেটা হল মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। বাংলাদেশের কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ব্যাপক। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের মাত্র ৩০-৪০% বাজারমূল্য পান, যা তাদের জন্য এক ধরনের শোষণ। এই অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ ভয়াবহ খাদ্য সংকটের দিকে এগিয়ে যাবে। তাই এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কৃষি উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জলবায়ু সহনশীল ফসল চাষ, জৈব কৃষি এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে।
এছাড়া, হিমাগার ও আধুনিক গুদাম নির্মাণ, কৃষকদের সরাসরি ভোক্তাদের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে সরাসরি বিপণন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং বীজ-সারের দাম সহনীয় রাখতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো রয়েছে এদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে। আজকের যুবসমাজের হাত ধরেই খাদ্য সংকট ও কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তরুণরা প্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিক কৃষি বিপ্লবের রূপকার হতে পারে। উন্নত বিশ্বে ড্রোন ব্যবহার করে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি আনতে পারে তরুণরা। পাশাপাশি, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ইন্টারনেট-ভিত্তিক চাষাবাদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে সঠিক সময়ে পানি, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিশ্চিত হবে। তরুণরা স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান এবং উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার সম্পর্কিত দিক-নির্দেশনা দিতে পারে, যা কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। এছাড়া, স্টার্টআপের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য অটোমেটেড সেচ ব্যবস্থা, মাটি পরীক্ষা, ডিজিটাল কৃষি বাজার তৈরি করতে পারে।
তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষি খাতে বিনিয়োগ করে কৃষকদের লাভবান করতে পারে, যা খাদ্য উৎপাদনও বাড়াবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, উচ্চশিক্ষায় কৃষি-প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা উচিত। তরুণদের উচিত কৃষিকে কেন্দ্র করে প্রচুর গবেষণা করা, যাতে নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং কৃষি উপকরণ, চাষাবাদের নিয়ম আবিষ্কার করা সম্ভব হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে "কৃষি উদ্যোক্তা কোর্স" চালু করা দরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা কৃষি খাতকে পেশা হিসেবে নিতে উৎসাহিত হন। কৃষিতে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণ কৃষিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের কৃষি খাত এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে টিকে থাকতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রয়োগ জরুরি। এই সংকট মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে তরুণ প্রজন্ম। তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল কৃষি বিপণন, স্মার্ট ফার্মিং, সংরক্ষণ ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়নে তরুণদের কার্যকর উদ্যোগ খাদ্য সংকট ও কৃষি বিপণন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জগুলো সহজেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
এখন সময় এসেছে তরুণদের কৃষি খাতে সম্পৃক্ত করার, যাতে তারা শুধুমাত্র চাকরি খুঁজবে না, বরং উদ্যোক্তা হয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেতৃত্ব দেবে। নতুন যুগের কৃষি মানে, তরুণদের নেতৃত্বে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়—এটাই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৃষি বিপ্লবের মূলমন্ত্র। সরকারের, কৃষকের, কৃষি সংস্থাগুলোর এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমেই খাদ্য সংকট এবং কৃষি বিপণন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে, যা বাংলাদেশের কৃষি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলবে এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
এভাবে, তরুণ প্রজন্মের উদ্যোগে কৃষি খাতে উন্নয়ন সম্ভব, যা বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নতির পথে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই

Post a Comment